কাতার বিশ্বকাপে প্রযুক্তির ব্যবহার

প্রকাশঃ ১০:৫৫ মিঃ, নভেম্বর ১৮, ২০২২
Card image cap

ফুটবলারদের পারফরম্যান্সের আরও বিশ্লেষণী ও নিখুঁত তথ্য পেতে সংযোজন করা হয়েছে ডেটা অ্যাপ। ৩২টি দলের প্রতিটি ফুটবলার ম্যাচের পর নিজের খেলাসম্পর্কিত তথ্যগুলো দেখতে পারবেন। এছাড়া নিজেদের সিটে বসে স্মার্টফোন অ্যাপ, As-app এর মাধ্যমে ফুড অর্ডার করতে পারবেন দর্শকগণ।

টেকওয়ার্ল্ড প্রতিনিধি:

ভিশন ২০২০-২৩ এ ফিফার মূল প্রতিশ্রুতি হল ফুটবলে প্রযুক্তির পূর্ণ ব্যবহার। ফুটবল ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে, ফিফা তাদের এই ভিশনকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে মাঠে এবং মাঠের বাইরে ফুটবল অনুরাগীদের এক নতুন ধরণের অভিজ্ঞতা দিতে যাচ্ছে কাতার বিশ্বকাপ। আসুন জেনে নেয়া যাক কাতার বিশ্বকাপে কি কি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে ফিফা-

প্রথম টেকনো বল

কাতার বিশ্বকাপে ব্যবহার করা হবে অ্যাডিডাসের তৈরি বল ‘আল রিহলা’। ‘আল রিহলা’ আরবি শব্দ। বাংলায় যার অর্থ ‘ভ্রমণ’। চামড়ায় তৈরি বলটিতে আছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। বলের নিখুঁত গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য এর ভেতরে ৫০০ হার্জ আইএমইউ সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।

যে তথ্য ব্যবহার করে নিখুঁত সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রযুক্তিসম্পন্ন বল ব্যবহার করা হচ্ছে এবারই প্রথম।

প্রথম আধা–স্বয়ংক্রিয় অফসাইড প্রযুক্তি

কাতার বিশ্বকাপ থেকেই মাঠে কার্যকর হবে এই প্রযুক্তি। খেলার গতি ধরে রাখা এবং নিখুঁত সিদ্ধান্ত নিতেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। ছেলেদের বিশ্বকাপে প্রযুক্তিটি এই প্রথম ব্যবহার করা হবে।প্রতিটি স্টেডিয়ামের ছাদের নিচের অংশে ১২টি ট্র্যাকিং ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। কোনো খেলোয়াড় অফসাইড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও ম্যাচ অফিশিয়ালদের কাছে অফসাইড সংকেত চলে যাবে।


ফুটবলারদের জন্য ডেটা অ্যাপ

ফুটবলারদের পারফরম্যান্সের আরও বিশ্লেষণী ও নিখুঁত তথ্য পেতে সংযোজন করা হয়েছে ডেটা অ্যাপ। ৩২টি দলের প্রতিটি ফুটবলার ম্যাচের পর নিজের খেলাসম্পর্কিত তথ্যগুলো দেখতে পারবেন। ডেটার মধ্যে থাকবে ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ কোন মুহূর্তে তিনি কেমন খেলেছেন, বল পায়ে কেমন ছিলেন, কতটুকু কী প্রচেষ্টা ছিল। 

এই অ্যাপটি সম্পর্কে ফিফার ফুটবল টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন ডিরেক্টর জোহানেস হোলসমুলার বলেছেন, ‘মাঠের যারা মূল কারিগর, তাদের জন্য সম্ভাব্য সেরা প্রযুক্তির ব্যবস্থা করেছে ফিফা।’


স্টেডিয়ামের বাতাস শীতল রাখা

কাতারে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা খুব বেশি, সমুদ্র থেকে গরম হাওয়া ছোট এই দ্বীপ রাষ্ট্রটির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তাই আল জানউব স্টেডিয়ামের ছাদ এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে বাতাস এর চারপাশ ঘিরে এবং ছাদের খোলা অংশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ছাদের রঙও হালকা রাখা হয়েছে যাতে সূর্যের আলো তাতে প্রতিফলিত হয় এবং ছাদ শীতল রাখে।


পিচ এবং স্ট্যান্ডগুলো ঠাণ্ডা রাখা

যেদিন ম্যাচ হবে, ভেতরের স্ট্যান্ডগুলো ৪০ হাজার মানুষে ভর্তি থাকবে। আর প্রতিটি মানুষের শরীর থেকে তাপ আর আর্দ্রতা তৈরি হবে।একদিকে কাতারের আবহাওয়ার উত্তাপ আর অন্যদিকে ভেন্যুর ভেতর মানুষের শরীর থেকে সৃষ্ট তাপ যুক্ত হওয়ায় সেখানে কার্যকর একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজন।স্ট্যান্ডে ফুটবল দর্শকদের প্রত্যেকের আসনের নিচে ভেন্টিলেটার বসিয়ে সেখান দিয়ে হাওয়া চালিয়ে আসন শীতল রাখা হচ্ছে।

শাওয়ারের যেমন পানির ধারা বের হয়, তেমনভাবে সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস ছাড়া হবে, যা দর্শকদের চারপাশ থেকে ঘিরে রাখবে।

এ তো গেল দর্শকদের ব্যববস্থা, পিচে খেলোয়াড়দের উপায় কি হবে? তাদের জন্যও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

বিশ্বকাপের সময় পিচের ওপর একটা শীতল আস্তরণ তৈরিতে সাহায্য করতে বড় বড় ঝর্ণামুখ দিয়ে স্টেডিয়ামে ঠাণ্ডা বাতাস সঞ্চালন করা হচ্ছে।এতে স্টেডিয়ামের ভেতর ১৮ থেকে ২৪ ডিগ্রি তাপমাত্রার একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার বুদ্বুদ তৈরি হবে। আর সেটা কখনই মাটি বা আসনের স্ট্যান্ড থেকে দু'মিটারের বেশি ওপরে উঠবে না। কখনই মনে হবে না মরুভূমির আকাশে ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝটকা ছাড়া হচ্ছে।ঠাণ্ডা বাতাস যখন আবার গরম হয়ে উঠবে, তখন এক্সট্রাক্টার ফ্যান ওই গরম বাতাস টেনে নিয়ে যাবে মধ্যবর্তী একটা এলাকায়।সেখানে ওই বাতাসকে ফিল্টার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আবার শীতল করা হবে এবং স্টেডিয়ামে পুনঃসঞ্চালন করা হবে। এর মধ্যে দিয়ে বাতাসের সঞ্চালন চক্র সম্পূর্ণ হবে।

ওয়াইফাই ও স্মার্ট চার্জিং স্টেশন

EIPapm শেডিং ওয়াইন্ড টার্বাইন সোলার প্যানেল ও বাইফেসিয়াল ফটোভোল্টেক প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, যার ছায়ায় বসে ফোন ইউএসবি পোর্টের মাধ্যমে বা ওয়্যারলেসলি চার্জ করা যাবে। এছাড়া EIPalm কে ওয়াইফাই হটস্পট হিসেবেও ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। এডভার্টাইজিং, মিস্ট কুলিং, সার্ভেইলেন্স ক্যামেরা, লাইটিং ও স্পিকার ও EIPalm এর অংশ।


অপসারণযোগ্য স্টেডিয়াম

স্টেডিয়াম-৯৭৪ কে একদম অপসারণগ্য করে তৈরি করা হয়েছে। ঠিক খেলনার মত করেই পুনরায় খুলে ফেলা যাবে পুরো স্টেডিয়ামকে। শিপিং কনটেইনার এবং ইস্পাত ফ্রেম থেকে নির্মিত এই স্টেডিয়ামটি তাই কাতারের একটি আইকনিক স্টেডিয়াম।

স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে খাবার অর্ডার

নিজেদের সিটে বসে স্মার্টফোন অ্যাপ, Asapp এর মাধ্যমে ফুড অর্ডার করতে পারবেন দর্শকগণ। থাকছেনা কোনো ধরনের অর্ডার লাইনে দাড়ানোর ঝামেলা কিংবা খেলার গুরুত্বপূর্ণ মোমেন্ট মিস করার সম্ভাবনা। অ্যাপের মাধ্যমে ফুড অর্ডার করার পর এক্সপ্রেস কিউ এর মাধ্যমে খাবার সিটে পৌঁছে যাবে।

সহজে ব্যবহারযোগ্য নিজস্ব ওয়েবসাইট

কাতার বিশ্বকাপে তৈরি করা হয়েছে একটি স্বতন্ত্র ওয়েবসাইট। এটিতে টিকিট থেকে শুরু করে হোটেল, যাতায়াত, দর্শনীয় স্থান সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এই প্ল্যাটফর্মটিতে।

দেশ ঘুরে দেখার অ্যাপ্লিকেশন

বিশ্বকাপের খেলা দেখতে আসা পর্যটকের জন্য থাকছে নাভবাডি অ্যাপ। এটি কাতারে ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য প্রদান করবে। স্টেডিয়ামগুলোর অবস্থানসহ হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ, যানবাহন ইত্যাদির খোঁজ পাওয়াও যাবে অ্যাপে। এই অ্যাপের আওতায় থাকছে প্রতিটি ভেন্যুতে যাওয়ার জন্য বৈদ্যুতিক বাস চলাচলের সময়সূচি।

এসব আয়োজন দেখে বোঝা যাচ্ছে, প্রথমবারের মত আরববিশ্বে আয়োজিত এই বিশ্বকাপে দেখা মিলবে অনেক নতুন কিছুর। তাই বিগত সকল বিশ্বকাপের চেয়ে এবারের বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে অনন্য।






সংবাদটি পঠিত হয়েছেঃ ৫৩ বার