টুইটারের ভবিষ্যত- পতন নাকি দেউলিয়া?

প্রকাশঃ ০৩:০০ মিঃ, নভেম্বর ২৩, ২০২২
Card image cap

খোদ টুইটারের মালিকই সতর্ক করেছেন টুইটারের দেউলিয়া হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। তবে গবেষকরা বলছেন, মাস্কের যে পরিমাণ ব্যক্তিগত সম্পদ রয়েছে তাতে করে তিনি ইচ্ছা করলেই টুইটার পুণরূদ্ধার করতে পারবেন।

টেকওয়ার্ল্ড প্রতিনিধি:

হ্যাশট্যাগ "RIPTwitter" এখনকার ট্রেন্ড। টুইটার ব্যবহারকারীরা তাড়াহুড়া করে টুইটার থেকে নিজেদের সকল ডাটা সরিয়ে নিয়ে বিকল্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্থানান্তরিত হচ্ছে। টুইটারের নতুন মালিক ইলন মাস্কও ট্রেন্ড থেকে দূরে নন। তিনিও তার টুইটারে, এর লোগো সম্বলিত একটি কবরের নামফলকের ছবি পোস্ট করেছেন। মাস্কের এহেন কর্মকাণ্ড দেখে নড়েচড়ে বসেছেন বিশ্লেষকরা, তবে কি সত্যিই টুইটারের যুগ শেষ হতে চলেছে।

ইলন মাস্ক দায়িত্ব নেয়ার আগেও টুইটারের এমন কোন আহামরি ব্যবসা ছিল না। কোম্পানিটি কখনো কখনো লাভের মুখ দেখত। এর প্রতিদ্বন্দী অনান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক কিংবা টিকটকের তুলনায় আয় অনেক কম ছিল। তাই টুইটারের দেওউলিয়া হয়ে যাওয়া খুব একটা অসম্ভব কোন ব্যাপার নয়।

কেন এই বিপর্যয়?

বিশ্বের শীর্ষ ধনী মাস্ক গত ২৭ অক্টোবর টুইটারের মালিকানা গ্রহণ করেন। তিনি ৪ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারে টুইটার কেনেন। গত মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে টুইটারের অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে অস্থিরতা। কোম্পানিটি কর্মী ছাঁটাই, একটি বিজ্ঞাপনদাতার বয়কট এবং এখন তার অবশিষ্ট কর্মীদের মধ্যে গণ পদত্যাগের কারণে টালমাটাল পরিস্থিতিতে রয়েছে। 

টুইটারের মালিকানা গ্রহণ করেই সিইও পরাগ আগারওয়ালসহ কোম্পানির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেন মাস্ক। কর্মীদের কর্মঘণ্টা বাড়িয়ে ছুটি বন্ধ করেছেন। যাঁরা বাড়িতে বসে অফিস করছিলেন, তাঁদের অফিসে এসে কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব পদক্ষেপসহ তিনি টুইটারের নিয়মনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন।

ব্যবহারকারীদের ৮ ডলারে সাবক্রিপশন ফি তে ব্লু ব্যাজ, ভুয়া এ্যাকাউন্টের বিরূদ্ধে অভিজান পরিচালনা, শির্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের এ্যাকাউন্ট স্থগিত ইত্যাদি একের পর এক নতুন নতুন নিয়ম নীতি দিয়ে টুইটারকে তিনি অস্থির করে তোলেন।

টুইটারের পতন হতে পারে?

মাস্ক দায়িত্ব গ্রহণের পর বেশ কিছু সংখ্যক ইঞ্জিনিয়ার টুইটার ছেড়ে চলে গেছেন। যদিও মাস্ক বলেছিলেন, তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করলে টুইটার আরো বেশি প্রযুক্তিবান্ধব হয়ে উঠবে, বিশেষকরে ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য চমৎকার সব কোড তৈরি করা হবে এবং দলগতভাবে টুইটারকে আরো উন্নত করতে কাজ করা হবে। এত ভাল ভাল কথা বলেও মাস্ক তার ইঞ্জিনিয়ারদের হারান।

বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, প্রযুক্তিগত ত্রুটি, বাগ, হ্যাকারদের আক্রমণ, সার্ভার ডাউন ইত্যাদী যে কোন ঘটনা ঘটে টুইটার ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে টুইটার ক্র্যাক করা শুরু করেছে। টুইটারে টুইট করার ক্ষেত্রে নানারকম সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সিকিউরিটি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক স্টিভেন মারডক বলেছেন, প্ল্যাটফর্মটি "কমপ্লেক্স ফেইলুরের" সম্মুখীন হতে পারে, যা ম্যানুয়াল মেইট্যান্যান্স এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। তিনি আরো বলেন পদত্যাগ করা প্রকৌশলিদের জায়গায় নতুন প্রকৌশলি প্রতিস্থাপন সহজ হবে না। টুইটার নতুন কর্মী নিয়োগের চেষ্টা করতে পারে বা বিদ্যমান কর্মীদের দিয়ে পুনরায় কাজ করতে পারে, তবে পূর্বের ন্যায় কাজের গতি ফিরে পেতে এবং কিছুকে একটা শৃঙ্খলার ভিতর নিয়ে আসতে মাস এমনকি বছর লেগে যেতে পারে। প্রতিটি বৃহৎ ওয়েবসাইটের একটি নিজস্ব ডেভলপিং সিস্টেম থাকে বাইরে থেকে যে কেও এস চট করে তাতে অভ্যস্ত হতে পারে না।” সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

এমনকি মাস্ক আসার আগেই সেখানে সমস্যার দেখা দিচ্ছিল। টুইটারের প্রাক্তন নিরাপত্তা প্রধান, পিটার জাটকো সতর্ক করেছেন যে তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ ছিল। তাই তিনি যে কোন মূহুর্তে বড় ধরণের হ্যাকিংয়ের আশঙ্কা করছিলেন। মাস্ক সেই আশঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছেন।

টুইটার কি দেউলিয়া হতে পারে?

খোদ টুইটারের মালিকই সতর্ক করেছেন টুইটারের দেউলিয়া হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। খবর: ফ্রান্স২৪

টুইটারের সব কর্মীর সঙ্গে বৈঠক করে মাস্ক কর্মীদের বলেন, কোম্পানিটি আগামী বছর কোটি কোটি ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। মাস্কের মালিকানায় টুইটারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আগে থেকেই বিশেষজ্ঞরা নানা আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিলেন। এখন মাস্ক নিজেই টুইটার নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করলেন। প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। এই আশঙ্কার মধ্যেই টুইটারের তিনজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার পদত্যাগ যেন টুইটারকে আরো হুমকির মুখে ফেলল।

এছাড়াও টুইটারের রয়েছে অর্থনৈতিক সংকট। টুইটার গত ১০-১২ বছরের মধ্যে বড়ধরণের অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। মাস্ক বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি। তাই প্রথমে  ধারণা করা হয়েছিল তিনি এ ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু তিনি ইতিমধ্যেই তার নিজের অর্থের বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করেছেন - ৩০ বিলিয়ন ডলার ইক্যুইটি সহ টুইটারে একটি পূর্বের অংশীদারিত্ব এবং তার সহযোগীদের কাছ থেকে ৭ আরো বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতিতে – মোট ৪৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছেন। 

তবে গবেষকরা বলছেন, মাস্কের যে পরিমাণ ব্যক্তিগত সম্পদ রয়েছে তাতে করে তিনি ইচ্ছা করলেই টুইটার পুণরূদ্ধার করতে পারবেন।

যদি বিজ্ঞাপণদাতারা ফেরত না আসে তাহলে সেটি হবে টুইটারের জন্য অশনি সংকেত। কারণ কোম্পানিটির ইতিমধ্যেই ১৩ বিলিয়ন ডলার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরছে এবং প্রত্যেক বছর সুদের হার ১ বিলিয়ন ডলার।

টুইটারের পতন বা দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও ব্লুমবার্গ বলছে, এই ধরনের পদক্ষেপ আপাতত অসম্ভবই বলা যায়।  ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের বোঝা সত্ত্বেও, শুধু হাতে থাকা নগদ অর্থই কোম্পানিটিকে ভালো সময়ের জন্য চালিয়ে যেতে পারবে। বিশ্বের  শীর্ষ ধনী ব্যক্তি হিসেবে মাস্কের নিজেরও অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে। চাইলেই তিনি বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ এখানে বিনিয়োগ করতে পারবেন, যদি সত্যিই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।


সংবাদটি পঠিত হয়েছেঃ ৩৭ বার