বাতিল হবে না ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, বছরের শেষে আসছে সংশোধনী

প্রকাশ: ৩ মে, ২০২৩, ১১:৪১
Card image cap
ছবি: টেকওয়ার্ল্ড

 এই আইনের সমস্যা দূর করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর জন্য আইসিটি ও আইনমন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে গঠিত হচ্ছে একটি কমিটি, যাদের পরামর্শ অনুযায়ী এবছরের শেষের দিকে আসবে এই আইনের সংশোধনী।

নাজনীন নাহার

সর্বস্তরে সমালোচিত ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) বাতিলের কোন সম্ভাবনা নাই জানিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, দেশের গণমাধ্যম এবং বাক স্বাধীনতার সুরক্ষায় প্রণীত ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন বাতিলের কোন সম্ভাবনা নাই। তবে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে আইনটি সংশোধন করার চেষ্টা করা হবে। কোনোভাবেই আইনটি বাতিল করা হবে না। 

তিনি উল্লেখ করেছেন, এই আইনের সমস্যা দূর করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর জন্য আইসিটি ও আইনমন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে গঠিত হচ্ছে একটি কমিটি, যাদের পরামর্শ অনুযায়ী এবছরের শেষের দিকে আসবে এই আইনের সংশোধনী।

বুধবার (৩ মে) বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস-২০২৩ উপলক্ষে ইউনেস্কো ঢাকা, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং আর্টিকেল নাইনটিনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘শেপিং এ ফিউচার অব রাইটস’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হিসেবে নেয়া হয়েছে ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সকল প্রকার মানবাধিকারের চালিকাশক্তি’।  

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপব্যবহার হয়েছে স্বীকার করে নিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগের শুরুর দিকে ‘মিসইউজ’ ও ‘অ্যাবিউজ’ হয়েছে। এটি সরকার স্বীকার করে। সরকার উদ্যোগ নেয়ায় এর অপপ্রয়োগ আগের থেকে হ্রাস পেয়েছে। এর অপপ্রয়োগ আরও কমাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পরিশুদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সবার জন্য গ্রহণযোগ্য আইন করা হবে।

এবছর সারাবিশ্বে পেশাগত দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ৬৭ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে, যা বিগত বছরের তুলনায় দ্বিগুন। তার মানে সাংবাদিকদের উপর নির্যাতন কমছে না, বরং বাড়ছে। সাংবাদিকতার উৎকর্ষতা এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে সংশ্লিষ্টদের চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তন করা সময়ের দাবি। নতুন নতুন গণমাধ্যমের সৃষ্টি উৎসাহব্যঞ্জক হলেও এগুলোর বৈধতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বৈধ সাংবাদিকতার জন্য এটাও এক ধরনের হুমকিস্বরূপ।

সংসদে প্রথম আলো প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে সাংবাদিকদের জন্য হুমকি নয় কি? এমন প্রশ্নের উত্তরে আইনমন্ত্রী বলেন, এটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বাক স্বাধীনতা, যা তিনি ব্যবহার করেই এই কথা বলেছেন। প্রথম আলোর সম্পাদক ও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলার বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা করার অধিকার সবার আছে। তবে সত্য তুলে ধরতে হবে। একটি ঘটনার দুটি সাইড (দিক) থাকে। আপনারা দুই সাইডই তুলে ধরবেন। জনগণ ঠিক করবে কোনটি সত্য, কোনটা মিথ্যা আর কোনটা সঠিক।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আলোচক হিসাবে উপস্থিত  ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ, সুইডেনের রাষ্ট্রদূত অ্যালেক্স বার্গ ফন লিন্ডে, জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গুইন লুইস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ও ঢাকা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক রিয়াজ আহমেদসহ প্রমুখেরা।                                                        

স্বাগত বক্তব্যে ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের অফিসার ইন চার্জ সুশান ভেইজ বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি। চিন্তা-ভাবনার ভিন্ন মতামতকে উৎসাহিত না করে, বাস্তবতাকে যাচাই না করে, গঠনমূলক সমালোচনার গ্রহণের মানসিকতা ছাড়া গণতন্ত্র একটি অস্পষ্ট ধারণা মাত্র। এই কথাগুলো মনে করিয়ে দেবার জন্যেই ৩০ বছর ধরে পালিত হচ্ছে এই প্রেস ফ্রিডম ডে বা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস।

মূল বক্তব্যে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গুইন লুইস বলেন, মানবাধিকারের মতোই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের অন্যতম মৌলিক মানবিক অধিকার, যা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে ৩০তম প্রেস ফ্রিডম ডে। বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়নের এবং জীবন যাত্রার সাথে মতপ্রকাশ বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে সর্ম্পকিত। মুক্ত ম প্রকাশের স্বাধীনতা সচেতন এবং টেকসই সমাজ গঠনে সহায়তা করে।

আলোচক হিসাবে কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আমরা একটি মৌলিক মানবিক অধিকার বলেই মনে করি। আমরা মানবাধিকার কমিশন সাংবাদিকদের স্বার্থ সংরক্ষণে সবর্দা চেষ্টা করে থাকি।

গীতিআরা নাসরিন বলেন, দেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা বেড়েছে। নতুন নতুন মাধ্যমে চর্চা হচ্ছে সাংবাদিকতার। এর অর্থ এই নয় যে, দেশে গণমাধ্যমে স্বাধীনতার চর্চাটি বিদ্যমান।

রিয়াজ আহমেদ বলেন, এবছর সারাবিশ্বে পেশাগত দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ৬৭ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে, যা বিগত বছরের তুলনায় দ্বিগুন। তার মানে সাংবাদিকদের উপর নির্যাতন কমছে না, বরং বাড়ছে। সাংবাদিকতার উৎকর্ষতা এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে সংশ্লিষ্টদের চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তন করা সময়ের দাবি। নতুন নতুন গণমাধ্যমের সৃষ্টি উৎসাহব্যঞ্জক হলেও এগুলোর বৈধতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বৈধ সাংবাদিকতার জন্য এটাও এক ধরনের হুমকিস্বরূপ। এছাড়াও জটিলতা বাড়াতে ডিজিটাল আইন, আইসিটি আইনগুলোর দুর্বল এবং অপপ্রয়োগ তো রয়েছেই।

ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, নির্ভীক সাংবাদিকতায় ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন অনেক বড় একটি প্রতিবন্ধকতা। মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখে নির্ভীক সাংবাদিকতায় এই আইনের যে শাস্তি রয়েছে তা বেশ উদ্বেগজনক।

গণমাধ্যমে নারীর অংশগ্রহণ আশাপ্রদ নয় মন্তব্য করে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত অ্যালেক্স বার্গ ফন লিন্ডে বলেন, গণমাধ্যমে নারীর অংশগ্রহণ কিছুটা বাড়লেও, নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। সাংবাদিকতায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে নারীবান্ধব কর্মক্ষেত্র গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।

আলোচনা শেষে সমাপনী বক্তব্যে ট্রান্সফারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে পবিবর্তন,পরিমার্জন করে বা যেভাবেই ঢেলে সাজানো হোক না কেনো, তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য সুখকর কিছু হবে না। তাই এটির সংশোধন আমরা মানতে পারব না।  আমাদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য ওহবে না। তাই আমরা ‘আইনটি বাতিলের দাবি জানাই।

সংবাদটি পঠিত হয়েছে: ২৫২ বার